নবজাগরণ ডেস্ক:
বিশ্ব এখন দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্বে অস্থির। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রতিটি অঙ্গনে প্রতিফলিত হচ্ছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য প্রকৃত সংকট অন্য জায়গায়-নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ। পৃথিবীর অন্যত্র মহাশক্তিরা সামরিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের খেলায় মেতে উঠলেও, ভারত দক্ষিণ এশিয়ার ভেতরে পানি আগ্রাসনের নতুন ঔপনিবেশিক নকশা বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান-এই দুই মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র-ভারতের এই ষড়যন্ত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
ভারতের পানি আগ্রাসনের ইতিহাস:ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই নদীর পানি নিয়ে প্রতিবেশীদের প্রতি আগ্রাসী মনোভাব দেখাতে শুরু করে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, যমুনা, সিন্ধু, ঝেলাম, চেনাব-মোট ৫৪টি অভিন্ন নদীর প্রবাহ ভারত নিয়ন্ত্রণ করছে।
১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি পানি সংকটে ফেলে। কাশ্মীর দখলের পর পাকিস্তানের নদীগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। ইন্দাস ওয়াটার ট্রিটি সত্ত্বেও ভারত নতুন নতুন বাঁধ নির্মাণ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে পরিবর্তন করছে।
বর্তমানে ভারত ৪০০টির বেশি ছোট-বড় বাঁধ তৈরি করে পানি আটকে রাখছে।বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। নদীই এ দেশের কৃষি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনের প্রাণ। কিন্তু ভারতের একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশকে চরম সংকটে ফেলেছে।শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা ও তিস্তার পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় ফসল উৎপাদন ২৫% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী)।
শুকনো মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে, ফলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে।
অন্যদিকে বর্ষায় ভারত হঠাৎ করে পানি ছেড়ে দেওয়ায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। কৃষি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবনে এর ধ্বংসযজ্ঞ অপরিমেয়। শুধুমাত্র ২০২২ সালের বন্যায় বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
পাকিস্তানের সংকট:ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ইন্দাস ওয়াটার ট্রিটি (১৯৬০) থাকলেও ভারত একের পর এক বাঁধ ও বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করে চুক্তির মূলনীতি ভঙ্গ করছে।
কাশ্মীরের নদীগুলোর ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানের জন্য অস্তিত্বের হুমকি।
কৃষি নির্ভর পাকিস্তানে সেচ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ছে। দেশটির জিডিপির ২০% কৃষি থেকে আসে, অথচ পানির সংকটে লাখ লাখ কৃষক দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, পানি সংকট অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে পাকিস্তান বিশ্বের সবচেয়ে পানি-সংকটাপন্ন দেশে পরিণত হবে।
দারিদ্র্য ও উন্নয়ন হুমকির মুখে:ভারতের পানি আগ্রাসন শুধু প্রতিবেশীদের কৃষিকে ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক উন্নয়ন ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করছে।বাংলাদেশে পানি সংকটের কারণে চাল, পাট, গম ও ভুট্টা উৎপাদনে ভয়াবহ পতন হয়েছে।
পাকিস্তানে তুলা ও গম উৎপাদন কমে গিয়ে রপ্তানি খাত ধ্বংসের মুখে।দুদেশেই খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে।পানি সংকটকে কেন্দ্র করে নতুন অভ্যন্তরীণ সংঘাতও দেখা দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইন ও ভারতের দায়:জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানি আইন (UN Watercourses Convention, 1997) বলছে-কোনো দেশ একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। নদীর পানি হতে হবে যৌথ সম্পদ। কিন্তু ভারত এ আইন অমান্য করছে প্রকাশ্যে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভারতের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা নীরব, কারণ তারা ভারতের বাজারকে প্রাধান্য দিচ্ছে।চীনও কৌশলগত কারণে নীরব পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করছে।
মুসলিম বিশ্বের দায়িত্ব:ভারতের পানি আগ্রাসন শুধু বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নয়, গোটা মুসলিম বিশ্বের অস্তিত্বকেও চ্যালেঞ্জ করছে।নদীর পানি নিয়ে ষড়যন্ত্র আসলে মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলোকে দুর্বল করার কৌশল।মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।ওআইসি’র (OIC) কার্যকর ভূমিকা দরকার।
সমাধানের পথ:
১.বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে একযোগে আন্তর্জাতিক আদালতে ভারতের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে।
২.চীন, তুরস্ক, ইরানসহ মুসলিম বিশ্বকে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগে যুক্ত করতে হবে।
৩. দক্ষিণ এশিয়ায় পানি ভাগাভাগির জন্য নতুন বহুপাক্ষিক চুক্তি করতে হবে।
৪.পানি আগ্রাসনের শিকার জনগণকে সংগঠিত করে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করতে হবে।
আল্লাহর সৃষ্টি নদী তার নিজস্ব নিয়মে প্রবাহিত হওয়ার কথা। নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখা, প্রতিবেশীকে কৃত্রিমভাবে দুর্ভিক্ষ বা বন্যায় নিমজ্জিত করা-এ এক অমানবিক অপরাধ। ভারত আজ তার প্রতিবেশীদের জন্য নতুন ঔপনিবেশিক শত্রু। বাংলাদেশের মানুষ যেমন এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকতে পারে না, পাকিস্তানের মানুষের প্রতিরোধও বৈধ।
আজ সময় এসেছে-মুসলিম বিশ্বকে ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অন্যথায় আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ভয়াবহ পানি-বিপর্যয়ের কারণে দারিদ্র্য ও ধ্বংসের অতল গহ্বরে পড়ে যাবে। নদীর পানি প্রকৃতির নিয়মে প্রবাহিত হোক-এই ন্যায়বিচারের জন্যই আজকের সংগ্রাম। এ সংগ্রাম শুধু পানি নিয়ে নয়,অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।
লেখক:মো:আবু তাহের পাটোয়ারী
সম্পাদক,নবজাগরণ
বিস্তারিত ভাবে জানতে অনলাইনে পড়ুন শেয়ার করুন:
www.thenabajagaran.com