একটি নীরব মায়ের বিদায় : জয়পাশার আকাশ আজ ভারী

কিছু মানুষ থাকেন,যাঁদের চলে যাওয়া শব্দ করে না-কিন্তু তাঁদের শূন্যতা চারপাশকে নিঃশব্দে কাঁদিয়ে দেয়। সৈয়দা জাহানারা বেগম ঠিক তেমনই একজন মানুষ ছিলেন জয়পাশার মানুষ আজ বুঝতে পারছে,একজন মায়ের মতো ছায়া আজ মাথার ওপর থেকে সরে গেছে।তিনি কখনো মাইক্রোফোন হাতে নেননি,সভা-সমাবেশে বক্তৃতা দেননি,সংবাদে শিরোনাম হননি-তবু তিনি ছিলেন একটি জনপদের নৈতিক শক্তি।বোয়ালমারী উপজেলার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান,সৈয়দ আব্দুর রহমান বাসার মিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের নেপথ্যের শক্তি ছিলেন এই মহীয়সী নারী। তাঁর ধৈর্য,সহনশীলতা ও প্রজ্ঞা ছাড়া হয়তো অনেক পথই এত দূর আসত না।

জয়পাশা হাই স্কুল মাঠে যখন তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হলো, তখন কেবল একটি মরদেহ নয়-একটি সময়,একটি মমতা, একটি নিঃস্বার্থ অধ্যায়কে মানুষ কাঁধে তুলে নিয়েছিল। চোখের জল লুকাতে পারেনি কেউ। কারণ তিনি কেবল‘চেয়ারম্যান পত্নী’ ছিলেন না,তিনি ছিলেন এলাকার অসংখ্য মানুষের আশ্রয়স্থল,দোয়ার হাত,নীরব সহানুভূতির নাম।
অনেক অসহায় মানুষ আজও জানে না-কখন,কীভাবে তিনি পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কারণ তিনি সাহায্য করতেন গোপনে, প্রচারবিমুখভাবে। তাঁর কাছে দান ছিল ইবাদত,মানুষ ছিল আমানত। কারও মেয়ের বিয়েতে,কারও চিকিৎসায়,কারও লেখাপড়ায়-তিনি ছিলেন অদৃশ্য ভরসা।

তাঁর জীবন ছিল আলোকিত,কিন্তু আলো ছড়াতেন নীরবে। সংসার,সন্তান,সমাজ-সবকিছুর ভার তিনি বহন করেছেন অবিচলভাবে। ধর্মপরায়ণতা,শালীনতা ও বিনয় ছিল তাঁর অলংকার। জয়পাশার মাটি আজ সেই বিনয়ী পদচিহ্ন খুঁজছে।
আজ তাঁর জানাজায় রাজনৈতিক নেতা,শিক্ষক,সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ-সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়েছেন। দল-মত, পরিচয়,বিভাজন ভুলে সবাই যেন একটাই কথা বলেছে-আমরা একজন ভালো মানুষকে হারালাম।জয়পাশা মাদ্রাসার মোহতামেম হযরত মাওলানা মুফতি আমীর হুসাইন(রহ.)-এর কণ্ঠে দোয়া ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আকাশও যেন ভারী হয়ে এসেছিল।

স্বামী ও পিতৃকুল-দুই দিক থেকেই তিনি একটি মর্যাদাপূর্ণ উত্তরাধিকার বহন করেছেন।কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিচয়-তিনি ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষ। এমন মানুষ খুব কমই জন্মায়,যাঁরা নিজের আলোয় নয়,অন্যকে আলোকিত করে বেঁচে থাকেন।আজ জয়পাশা শুধু একজন নারীকে হারায়নি-হারিয়েছে এক মমতাময়ী অভিভাবককে। তাঁর শূন্যতা কোনো পদবী দিয়ে পূরণ হবে না,কোনো স্মৃতিফলক দিয়ে ধরা যাবে না। তিনি বেঁচে থাকবেন মানুষের দোয়ার ভেতরে,ভালোবাসার স্মৃতিতে,আর নীরব অবদানের গল্পে।
আল্লাহ তায়ালা সৈয়দা জাহানারা বেগমকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। শোকাহত পরিবারকে দিন অসীম ধৈর্য।
আমরা হারালাম একজন মানুষ-যাঁর মতো মানুষ হারালে সমাজ নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে।

মো:আবু তাহের পাটোয়ারী
সম্পাদক,নবজাগরণ