মো:আবু তাহের পাটোয়ারী:
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে কে চালাবে-এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবলমাত্র সেই দেশের জনগণের।আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ন্যূনতম নীতিই তাই বলে। কিন্তু ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি,মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিলেন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে-
“ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ রদবদল না হওয়া পর্যন্ত আমরাই দেশটি চালাবো।”এটি কোনো কূটনৈতিক ভুল উচ্চারণ নয়। এটি একটি সরাসরি উপনিবেশবাদী ঘোষণা।এটি জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদের প্রকাশ্য লঙ্ঘন।এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সমান।সামরিক হামলা, অপহরণ ও তেল-একই সুতোয় বাঁধা আগ্রাসন প্রতিবেদনে স্পষ্ট-টানা কয়েক মাসের হুমকির পর যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন স্থানে সিরিজ বিমান হামলা চালিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী,স্থানীয় সময় রাত ২টা থেকে দেড় ঘণ্টা ধরে বিস্ফোরণ,যুদ্ধবিমানের গর্জন ও কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় কারাকাসের আকাশ।এরপরই ট্রাম্প দাবি করেন-ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ‘আটক’ করে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।এটি যদি সত্য হয়,তবে তা আন্তর্জাতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় অপহরণ।আর যদি অপপ্রচার হয়,তবুও এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ঘোষণা,যার উদ্দেশ্য-রাষ্ট্রকে ভীত, দুর্বল ও আত্মসমর্পণে বাধ্য করা।“ভেনেজুয়েলার মানুষের জন্য শান্তি”-এই মিথ্যার মূল্য কত রক্ত?ট্রাম্প বলেন,যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার মানুষের জন্য শান্তি চায়।এই বাক্যটি ইতিহাসে বহুবার শোনা গেছে-ইরাকে “শান্তি” আনতে গিয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল একটি সভ্যতা আফগানিস্তানে “শান্তি” প্রতিষ্ঠার নামে হত্যা করা হয়েছিল হাজার হাজার শিশু লিবিয়ায় “শান্তি” রক্ষার অজুহাতে একটি রাষ্ট্রকে বানানো হয়েছিল ব্যর্থ রাষ্ট্র আজ ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও সেই একই চিত্রনাট্য।শান্তির কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বোমা পড়ছে।
মানবাধিকারের কথা বলা হচ্ছে,কিন্তু প্রেসিডেন্ট‘আটক’ হচ্ছেন।গণতন্ত্রের কথা বলা হচ্ছে,কিন্তু ঘোষণা আসছে-
“আমরাই দেশটি চালাবো।”তেলই আসল লক্ষ্য-সবকিছু তারই আবরণ ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন-যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো শিগগিরই ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ করবে।এই এক বাক্যই পুরো আগ্রাসনের নগ্ন সত্য উন্মোচন করে দেয়।ভেনেজুয়েলার অপরাধ কী?পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুতের মালিক হওয়া সেই তেলের ওপর মার্কিন করপোরেট নিয়ন্ত্রণ অস্বীকার করা আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণের ফাঁদে না পড়া জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার চেষ্টা করা এই অপরাধের শাস্তি-নিষেধাজ্ঞা,অবরোধ,অর্থনৈতিক যুদ্ধ, সামরিক হামলা এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অপহরণের হুমকি।
আন্তর্জাতিক আইন:শক্তের পক্ষে,দুর্বলের বিরুদ্ধে
আজ প্রশ্ন উঠছে-জাতিসংঘ কোথায়?আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কোথায়?মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জরুরি বিবৃতি কোথায়?উত্তর নির্মম-এই প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর হয় কেবল দুর্বল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে।শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন আগ্রাসন চালায়, তখন আইন ছুটি নেয়।ভেনেজুয়েলায় হামলার পরপরই প্রেসিডেন্ট মাদুরো জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন,জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী মোতায়েন করেছেন। অথচ পশ্চিমা মিডিয়ার বড় অংশ এটিকে “স্বৈরাচারী প্রতিক্রিয়া” হিসেবে উপস্থাপন করছে।রাষ্ট্র রক্ষা কি তবে অপরাধ?চোখে কালো কাপড়-একটি প্রতীক একজন প্রেসিডেন্টের চোখে কালো কাপড় মানে কেবল একজন ব্যক্তির অপমান নয়।এটি একটি জাতিকে দেখিয়ে দেওয়া-তোমরা দেখবে না,বলবে না,প্রতিরোধ করবে না।আজ ভেনেজুয়েলা,কাল অন্য কোনো দেশ।
আজ লাতিন আমেরিকা,কাল এশিয়া বা আফ্রিকা।
আজ প্রেসিডেন্ট,কাল জনগণ।নীরবতা মানেই সহযোগিতা
এই মুহূর্তে যারা চুপ করে আছে,তারা নিরপেক্ষ নয়-তারা অপরাধের অংশীদার।আজ যারা বলে “এটি আমাদের বিষয় নয়”,তারা ভুলে যাচ্ছে-সাম্রাজ্যবাদ কখনো থামে না।
যে আগুন আজ ভেনেজুয়েলায়,কাল সেই আগুন অন্যত্র ছড়াবে।
বিপ্লব ছাড়া মুক্তি নেই
সাম্রাজ্যবাদ অমর নয়। ইতিহাসই তার প্রমাণ।
সাদ্দাম গেছে, গাদ্দাফি গেছে-কিন্তু তাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে সাম্রাজ্যবাদের আসল মুখ।আজ ট্রাম্পের ঘোষণায় সেই মুখ আর গোপন নেই।এটি এখন প্রকাশ্য দখলদারি।প্রকাশ্য লুটপাট।প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস।এই নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে বিশ্বের স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠী,বিপ্লবী শক্তি,
সাংবাদিক ও চিন্তক সমাজের এখনই সোচ্চার হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
চুপ থাকা মানে অপরাধ।
প্রশ্ন তোলা মানে বিপ্লব।
আর বিপ্লবই মানবতার শেষ আশ্রয়।
মো: আবু তাহের পাটোয়ারী
সম্পাদক: নবজাগরণ
অনলাইনে পড়ুন: www.thenabajagaran.com





