মো: আবু তাহের পাটোয়ারী:
জুলাই কোনো মাস নয়-জুলাই একটি রাষ্ট্রীয় শপথ
জুলাই কোনো ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়।জুলাই কোনো আবেগী স্লোগানও নয়।জুলাই হলো-রক্তের মাধ্যমে উচ্চারিত জনগণের শপথ।এই শপথ সরকার পরিবর্তনের ছিল না।এই শপথ ছিল-রাষ্ট্র বদলের।রাজপথে যে রক্ত পড়েছিল, তা কোনো দলের পতাকা উড়ানোর জন্য নয়। তা পড়েছিল- লুটেরা বন্দোবস্তের অবসান ঘটাতে দালাল রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে জনগণের হাতে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দিতে কিন্তু কয়েক মাস পেরোতেই যে প্রশ্নটা ভয়ংকরভাবে সামনে এসেছে,তা হলো-এই রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান কি আদৌ আমাদের শাসক,প্রশাসক ও বিচারকদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পেরেছে?
দুঃখজনক উত্তর:পারে নাই।
প্রশ্নবিদ্ধ প্রার্থীদের সংখ্যা: বিপ্লবের পরেও লুটেরাদের পুনর্বাসন বিপ্লব-পরবর্তী কোনো নির্বাচনের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত ছিল-নৈতিক পরিশুদ্ধি।কিন্তু বাস্তব চিত্র কী?খেলাপি ঋণগ্রস্ত এমপি প্রার্থী: ৪৫ জন দ্বৈত নাগরিকত্বধারী এমপি প্রার্থী:২২ জন মোট প্রশ্নবিদ্ধ প্রার্থী:৬৭ জন মোট সংসদীয় আসন: ৩০০ অর্থাৎ-প্রতি পাঁচজন এমপি প্রার্থীর একজনই প্রশ্নবিদ্ধ।বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী,বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ GDP-এর ১৫-১৭ শতাংশে পৌঁছেছে-যার বড় অংশ রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষিত গোষ্ঠীর হাতে।এই লুটেরারাই আজ আইনপ্রণেতা হতে চায়!এটা নির্বাচন নয়। এটা পুরোনো বন্দোবস্তের পুনর্বাসন প্রকল্প।
খেলাপি ঋণ ও দ্বৈত নাগরিকত্ব:রাষ্ট্রীয় আত্মসমর্পণের লাইসেন্স খেলাপি ঋণ কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়।
এটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অর্থনৈতিক আগ্রাসন।
আর দ্বৈত নাগরিকত্ব?এটা কোনো ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়।এটা আনুগত্যের প্রশ্ন।সংকটে দেশ ছাড়বে কারা?
রাষ্ট্র বিপদে পড়লে নিরাপদ আশ্রয় নেবে কারা?উত্তর সবার জানা।এই শ্রেণিকে সংসদে বসানো মানে-ভবিষ্যতের সংকটে রাষ্ট্রকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করে রাখা।
প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা:বিপ্লবের পরেও কেন একই মানসিকতা?বিশ্ব ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-যেখানে প্রকৃত বিপ্লব হয়েছে, সেখানে প্রথম আঘাত এসেছে প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায়।ফ্রান্স (১৯৫৮)দক্ষিণ আফ্রিকা(১৯৯৪)
চিলি (২০২০-২২)সবখানেই পুরোনো এলিট কাঠামো ভাঙা হয়েছে। বাংলাদেশে কী হয়েছে?একই আমলাতান্ত্রিক চেইন
একই বিচারিক পক্ষপাত একই ক্ষমতাবানদের সুরক্ষা কারণ একটাই-এই রাষ্ট্রযন্ত্র পুরোনো বন্দোবস্তের পাহারাদার।
ড.মুহাম্মদ ইউনূস ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার:জুলাইয়ের নৈতিক ফল এই অন্ধকার বাস্তবতার মাঝেও একটি সিদ্ধান্ত ইতিহাসে আলাদা হয়ে থাকবে-প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন। এটা কোনো দলীয় আপস নয়।এটা ছিল আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নৈতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য জনগণের কাছে আস্থার প্রতীক ড.ইউনূসের নেতৃত্ব মানে-ব্যক্তিগত লুটপাটমুক্ত রাষ্ট্রচিন্তা আন্তর্জাতিক চাপের সামনে মাথা না নোয়ানো ভারসাম্য দাতা নয়,জনগণকেন্দ্রিক দর্শন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বাইরে সংস্কারের চেষ্টা এই কারণেই পুরোনো বন্দোবস্তের শক্তিগুলো শুরু থেকেই এই সরকারের ধারাবাহিকতার শত্রু।
হাঁ’ভোট ও ড.ইউনূস সরকারের ধারাবাহিকতা:কেন এটি নির্ণায়ক আজ একটি সত্য পরিষ্কার-‘হাঁ’ভোট ছাড়া ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধারাবাহিকতা অসম্ভব।‘হাঁ’ভোট মানে-সংস্কার এজেন্ডাকে জনগণের সাংবিধানিক বৈধতা খেলাপি ঋণ ও লুটপাটের বিচারের পথ খুলে দেওয়া প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার
পুরোনো দলীয় বন্দোবস্তের প্রত্যাবর্তন চিরতরে রুদ্ধ করা
যারা‘হাঁ’ ভোটের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে,তারা আসলে বলছে-“আমরা ইউনূসের মতো নেতৃত্ব চাই না।আমরা চাই পুরোনো লুটেরারাই ফিরে আসুক।”এটাই তাদের প্রকৃত অবস্থান।
আন্তর্জাতিক গণভোটের শিক্ষা:জনগণই শেষ রায় দেয়
বিশ্বে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে শেষ কথা বলেছে জনগণ-গণভোটে।দক্ষিণ আফ্রিকা (১৯৯২): বর্ণবাদ অবসানে‘হাঁ’ ভোট চিলি (২০২০):স্বৈরশাসনের সংবিধান বাতিলে ৭৮% ‘হাঁ’নেপাল (২০০৮):রাজতন্ত্র অবসানে গণরায় ফ্রান্স (১৯৬২): রাষ্ট্র কাঠামো বদলে গণভোট সব জায়গায় একটি মিল- পুরোনো এলিট ও বিদেশি স্বার্থ ছিল‘না’ভোটে জনগণ ছিল‘হাঁ’ভোটে বাংলাদেশ আলাদা হবে কেন?
ভারতীয় আগ্রাসন ও দাদাগিরি:‘হাঁ’ভোট মানে সার্বভৌম ঘোষণা-সীমান্ত হত্যা, পানি বৈষম্য, বাণিজ্যিক অসমতা, রাজনৈতিক প্রভাব-এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।এগুলো একটি আধিপত্যবাদী কাঠামোর ফল।এই আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় শক্তি কী?বাংলাদেশের ভেতরের দালাল শ্রেণি।আর আশ্চর্য নয়-এই দালালরাই ‘হাঁ’ভোটের সবচেয়ে বড় বিরোধী।কারণ‘হাঁ’ভোট মানে-স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় স্বার্থে আপসহীন অবস্থান দাদাগিরির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গণরায়।
ভোট মানে মালিকানা:জনগণ বনাম বন্দোবস্ত
এই দেশে ভোটকে বহুদিন ধরে অর্থহীন করা হয়েছে।
কিন্তু সত্য হলো-ভোট মানে সরকার নয়,ভোট মানে রাষ্ট্রের মালিকানা।যারা ‘হাঁ’ভোট দেয়, তারা বলে-“এই দেশ আমাদের। এই সংবিধান আমাদের।”আর যারা‘হাঁ’ভোটের বিরুদ্ধে-তারা দাঁড়ায় জনগণের মালিকানার বিরুদ্ধে।
‘হাঁ’ভোট-একটি ব্যালট,একটি বিদ্রোহ‘হাঁ’ভোট কোনো কাগজ নয়।এটা-জুলাইয়ের রক্তের জবাব ড.ইউনূসের নৈতিক নেতৃত্বের সুরক্ষা লুটেরা বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সার্বভৌম ঘোষণা নতুন বাংলাদেশের জন্মঘোষণা দেশের মালিক জনগণ।আর সেই মালিকানা ফিরিয়ে নেওয়ার দিন-‘হাঁ’ভোটের দিন।
মো: আবু তাহের পাটোয়ারী
সম্পাদক, নবজাগরণ
অনলাইনে পড়ুন: www.thenabajagaran.com
সবাই বেশি করে দেশের স্বার্থে লেখাটি শেয়ার করুন





